23/11/2025
ঢাকা শহরের সবচেয়ে সাজানো-গোছানো ঝকঝকে এলাকা নিয়ে যদি কোনো রহস্য লুকিয়ে থাকে, তবে সেটা হলো হাতিরঝিল-এর ২৬ জুনের গভীর রাত। এই নীরব প্যাটার্নটি সবাই জানে না। আর যারা জানে তারা জানতে চায়ও না অথবা চেপে যায়।
আমি একজন পেশাদার সাংবাদিক। আমার কাজ নিরাপদ ও প্রমাণ-নির্ভর প্রতিবেদন তৈরি করা। ভূত-প্রেত ছায়া বা লোককথা এসব নিয়ে আমি লিখি না। কিন্তু যখন আমি ২০২৩ সালের জুলাই মাসে প্রথম “২৬ জুনের বাঁক” নিয়ে রিপোর্ট করতে গেলাম, তখন মনে মনে প্রশ্ন ছিল এটা কি সত্যিই নেহাতই কাকতালীয়? নাকি এত বছর ধরে একটা অদ্ভুত অজানা প্যাটার্ন কেউ ইচ্ছে করেই আড়াল করে রেখেছে?
ঘটনার শুরু ২০২৩ সালের জুনের শেষ সপ্তাহে। আমি পুলিশের সাপ্তাহিক দুর্ঘটনা রিপোর্ট যাচাই করছিলাম। হাতিরঝিল এলাকায় যে নৌ-পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ আর লেক অপারেশন ইউনিট আছে তাদের যৌথ রিপোর্টে একটি নির্দিষ্ট লাইন আমার চোখ আটকে দিল:
“স্থান-৩, বাঁক-৫৭: সামান্য পিছলে পড়ার ঘটনা লিপিবদ্ধ। কোনো হতাহত নেই।”
আমি চোখ সরু করে ভাবলাম বাঁক-৫৭? এই নাম আগে শুনেছি কোথায়? এটি কি শুধু কোনো অফিসিয়াল কোড নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ইতিহাস আছে?
পুরোনো ফাইল খুলে দেখি এক অদ্ভুত মিলের সমাহার:
২০১৪ সালের ২৬ জুনের রিপোর্ট: এক যুবক সাইকেল সামলে রাখতে না পেরে পানিতে পড়ে যায়। সামান্য চোট নিয়ে সে সুস্থ হয়।
২০১৭ সালের ঠিক ২৬ জুন: এক ডেলিভারি রাইডার স্কিড করে গুরুতর আঘাত পায়।
২০২০ সালের ২৬ জুন: এক বাদামওয়ালা সামান্য আঘাত নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করে তিনি লেখেন: “হঠাৎ পা পিছলে গেল।”
২০২৩ সালের ২৬ জুন: এক কলেজছাত্র মাঝরাতে ফোন ধরে হাঁটতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়।
সবগুলো ঘটনাই ঘটেছে একই জায়গায় হাতিরঝিল-এর সেই পরিচিত বাঁকটা স্থানীয়রা যাকে বলে “ব্রিজ–৫ এর পরের ছোট বাঁক।” আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো চারটি ঘটনাই ঘটেছে ২৬ জুন রাতে, সময় ১২টা থেকে ১টার মধ্যে।
এই চারজনের বয়স, পেশা, আর্থ-সামাজিক উৎস কোনোটাই মিলছে না। তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত বা পেশাগত কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের কোনো গল্পও এক নয়। কিন্তু তারিখটা? সময়টা? জায়গাটা? হুবহু একই। পরিসংখ্যানের এই অসম্ভব মিল আমাকে কেবল কৌতূহলী নয়, চিন্তিতও করে তুলল।
পরের দিন আমি সেই বাঁকে গেলাম। গরমের দুপুর, মাথার উপর প্রখর রোদ। বাঁকটিতে দাঁড়াতেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো রাস্তার একদিক যেন সামান্য “হালকা”। মানুষেরা হেঁটে যাচ্ছে, কেউ থামছে না। সবাই অন্যমনস্কভাবে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। এই আলো-ঝলমলে সড়কে এমন কোনো অসঙ্গতি চোখে পড়ার কথা নয়।
আমি কথা বললাম একজন স্থানীয় নিরাপত্তাকর্মী নাম তার রশিদুল।
২৬ জুনের ঘটনা নিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি চোখ নামিয়ে ফেললেন। ফিসফিস করে বললেন, “এখানে কিছু নেই, স্যার। কিছু না।”
-“তাহলে প্রতি বছর একই জায়গায় একই তারিখে দুর্ঘটনা হয় কেন?”
রশিদুল তখনও চোখ তুলে তাকালেন না, শুধু মাথা নিচু করে বললেন, “সেদিন… ওই সময়… রাস্তাটা একটু আলাদা হয়।”
আমি ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলাম, “আলাদা মানে কী?”
তিনি ঠোঁট চেপে বললেন, “কি জানি স্যার। মনে হয় ওই এক ঘণ্টা রাস্তা… ডুবে যায়।”
ডুবে যায়? ব্যাপারটা অদ্ভুত শোনাল। হাতিরঝিল একটি লেক কিন্তু তার উপর দিয়ে যাওয়া আধুনিক সড়ক কী করে এক ঘণ্টার জন্য ডুবে যেতে পারে? আমি আরও প্রশ্ন করতে চাইছিলাম, কিন্তু তিনি স্পষ্ট বললেন,
“সেদিন রাতে আমাকে কখনো দায়িত্ব দেয় না স্যার। আর দিলেও আমি করি না। আমি ওদিকে যাই না।” তার চোখে ভয়ের স্পষ্ট ছাপ ছিল। তার এই কথাটি ছিল আমার অনুসন্ধানের দ্বিতীয় সূত্র: কর্তৃপক্ষ কি তবে জেনেও না জানার ভান করছে।
আমি পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ড. নোমান ভাইয়ের কাছে গেলাম। তাকে চার বছরের পুলিশি রিপোর্ট দেখালাম। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে সব পড়লেন, তারপর বললেন, “২৬ জুন… সব একই জায়গায়, একই সময়ে?”
আমি মাথা হেলালাম। তিনি হালকা হেসে বললেন, “রাস্তা কি মানুষের মতো নির্দিষ্ট দিনে খারাপ মেজাজে থাকবে?”
তারপরই তিনি একটু গম্ভীর হয়ে চোখ উঁচু করলেন, “এমনটা… খুবই অদ্ভুত। সাধারণত মাটি ফুলে বা সঙ্কুচিত হয় বর্ষাকালে। কিন্তু প্রতি বছর ঠিক এই দিনে? আমি জীবনে এমন দেখিনি। হয়তো মাটির নিচে কোনো শূন্যস্থান আছে, যা বছরে একবার অদ্ভুতভাবে চাপ দেয়।”
তিনি নীরবে একটি সিদ্ধান্তমূলক মন্তব্য করলেন, “মাটির নিচে কিছু আছে… হয়তো একটি শূন্যস্থান । যা বছরে একবার চাপের পরিবর্তন ঘটায়। কোনো ভূতাত্ত্বিক কারণ ছাড়া এমনটা হওয়া সম্ভব নয়।”
রহস্যের সমাধান করতে তথ্যের পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিকোণও প্রয়োজন। আমি খুঁজে বের করলাম ২০২০ সালের সেই বাদামওয়ালা লোকটিক মোঃ ফরহাদ। তিনি ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন এবং সেদিন হালকা আঘাত পেয়েছিলেন।
আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার কি মনে হয়েছিল রাস্তা পিচ্ছিল ছিল?”
ফরহাদ মাথা নেড়ে বললেন, “না ভাই। পা পিছলায় নাই। জানো কি… মনে হয়েছিল হাতে কেউ টান দিল।”
আমি চমকে উঠলাম। “মানুষ?”
“না। বাতাস জোরে ছিল না। কেউ আশেপাশে ছিল না। মনে হলো নিচ থেকে… মাটি যেন টেনে ধরলো।” ফরহাদের সরল অথচ গা ছমছমে বিবরণ আমাকে স্থির থাকতে দিল না।
তারপর তিনি আরেকটি কথা বললেন যা আমার পুরো শরীরে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিল,
“ভাই, পড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আমার কানে লাগল একটা শব্দ। খুব ক্ষীণ। যেন কারও দীর্ঘশ্বাস।” একটি রাস্তার নীচে গভীর রাতে, চাপা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ! এটা কোনো লোককথা নয়, এটা একজন বেঁচে যাওয়া মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।
আমি হাতিরঝিলের নির্মাণ কাজের পুরোনো নথি উল্টাতে উল্টাতে একটি অদ্ভুত বিষয়ে পৌঁছালাম।
হাতিরঝিল প্রকল্পের প্রথম বড় মাটি কাটার কাজ শুরু হয়েছিল ২৬ জুন, ২০১১ সাল।
ঠিক সেই দিনই প্রথমবারের মতো সেখানে ভারী ড্রিল ঢুকে পূর্বের পুরোনো মাটির স্তর কেটে দেয়। ড্রিলিং রিপোর্টে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ লাইন লেখা ছিল:
“স্তর-৩ এর গভীরতা: অনিয়মিত শূন্যস্থান পাওয়া গেছে। সম্ভবত একটি পুরোনো নিষ্কাশন সুড়ঙ্গ বা মাটির গহ্বর।”
তারপর আর কোনো ফলো-আপ বা পরবর্তী তদন্তের উল্লেখ ছিল না। এই শূন্যস্থানটি হয়তো প্রকল্পের জরুরি কাজের চাপে উপেক্ষা করা হয়েছিল।
আমার মনে হলো সেই ড্রিল যেই শূন্যস্থানটিকে প্রথম আঘাত করেছিল সেটা হয়তো এখনো আছে। এবং প্রতি বছর ড্রিলিংয়ের সেই তারিখেই, মাটির নিচের চাপ সামান্য হলেও পরিবর্তিত হয়। কেন এমন হয়? কেউ জানে না। কিন্তু এটা নিছক দুর্ঘটনা নয় এটা হয়তো এক ধরনের । মাটিও হয়তো তার জন্ম বা আঘাতের বার্ষিকী পালন করতে পারে।
আমি ঠিক করলাম সমস্ত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আর মানবিক সাক্ষ্যকে মেলাতে এবার ২৬ জুন রাতে আমি নিজেই দাঁড়াবো সেই “বাঁক-৫৭” এ।
রাত ১২টা ১১ মিনিট। আকাশ শান্ত। হাওয়া নেই। রাস্তায় দুই দিকের ল্যাম্পপোস্টের আলো পড়ে তৈরি হয়েছে এক স্থির ছায়া। সবকিছু স্বাভাবিক।
১২টা ১৭ মিনিট। আমি প্রথম অস্বাভাবিকতা বুঝলাম। রাস্তার ওপরের আলো এক-দুই সেকেন্ডের জন্য হালকা কেঁপে উঠল। যেন স্থির আলোতে সামান্য স্ট্যাটিক নড়াচড়া করছে।
১২টা ২১ মিনিট। আমার জুতোর নিচের অ্যাসফল্ট বা পিচ খুব সামান্য “ঢেউ খেলল” যা একজন সাধারণ মানুষ হয়তো টেরই পেত না। কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে আমার চোখ প্রশিক্ষিত এবং মন সতর্ক ছিল।
রাত ১২টার একটু পরে আমি বাঁক-৫৭ এ দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখি পাশ দিয়ে একজন তরুণ হাঁটছে, মোবাইলে কথা বলছে। ঠিক সেই মুহূর্তে তার পায়ের নিচে কিছুটা ধুলো উড়ে গেল। মনে হলো, মাটির নিচ থেকে যেন হালকা চাপ উঠল।
সে সামান্য হোঁচট খেল। আমি সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে নিলাম। সে হাপ দিয়ে বলল, "ভাই… মনে হলো রাস্তা নিজেই নড়ল।"
আমি তাকে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় চলে এলাম। তারপর আমার পকেটে থাকা রেকর্ডারের ‘প্লেব্যাক’ চালালাম।
সেখানে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ মানুষ না, মেশিন না একটা চাপা নিঃশ্বাসের মতো, যেন পাথরের নিচে কেউ গভীর দম ছাড়ছে:
“...হ...”
শব্দটি ১২টা ২৬ মিনিটেই রেকর্ড হয়েছে। এটিই আমার চূড়ান্ত প্রমাণ।
পরের দিন আমি সেই প্রমাণসহ আমার প্রতিবেদন জমা দিলাম। বস সেটা পড়লেন, চোখ তুলে বললেন,
“প্রমাণ আছে?”
আমি বললাম, “রাস্তাটা নিজেই প্রমাণ।”
তিনি কাগজটা ভাঁজ করে রেখে বললেন,
“তুমি কি জানো, ২৬ জুনের ওই এক ঘণ্টায় হাতিরঝিল অপারেশন টিম প্রতি বছর অতিরিক্ত টহল দেয়?”
আমি থমকে গেলাম। “তারা জানে?”
বস হালকা হাসলেন।
“সবাই জানে।”
“শুধু লিখে না।”
আজও ভাবলে গা শিউরে ওঠে ঢাকা শহরের সবচেয়ে আলো ঝলমলে জায়গায় একটা রাস্তা আছে যেখানে প্রতি বছর, একই দিনে, মাটি সামান্য শ্বাস নেয়। আর সেই শ্বাসে অল্প একটু নড়ে ওঠে রাস্তা।
যারা টের পায়, বেঁচে যায়। যারা পায় না তারা বলে, “পা পিছলে গিয়েছিল।”
কিন্তু আমি জানি হাতিরঝিল-এর ২৬ জুনের বাঁক কখনো “পিছলে” না। ওটা শুধু নিজের পুরোনো ক্ষত মনে করে, তার গভীরের শূন্যতার কথা মনে করে বছরে একবার সামান্য কেঁপে ওঠে।
শেয়ার করুন যদি আপনি এমন রহস্যময় গল্পে বিশ্বাস করেন, আর দেখুন আপনার বন্ধুরাও কি মনে করে।
ুনের_বাঁক