15/08/2026
৬ বছর আগে আমার যমজ বাচ্চাদের জন্মের সময় একজন মা*রা যায়। আমার মেয়ে স্কুলের প্রথম দিন পার করে বাসায় এসে বলল: "আম্মু, আমার বোনের জন্য আরও একটা টিফিন ক্যারিয়ার গুছিয়ে দাও।"
আমার বয়স এখন ৩৭ বছর। ছয় বছর আগের কথা, আমার যমজ সন্তান জন্মের প্রসবের ব্যথা উঠেছিল।
হাসপাতালের ওটি-র (OT) ভেতর তখন এক হুলস্থুল কাণ্ড — ডাক্তাররা ছোটাছুটি করছিলেন, মেশিনের শব্দে চারপাশ কাঁপছিল। তারপর হঠাৎ করেই… এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
"যমজ বাচ্চাদের একজন, কাদছিলো। ডাক্তার আপা এসে আমাকে বললেন, "আপনার একটা বাচ্চা দুনিয়াতে আর বেঁচে নেই।"
মেডিকেল জটিলতা। আমি শেষবারের মতো তার মুখটা দেখার সুযোগ পর্যন্ত পাইনি।
আমরা তার আকিকা দিয়ে নাম রেখেছিলাম জেরিন। খুব নীরবে, ঘরোয়াভাবে।
আর এই সত্যিটা আমরা আমাদের অন্য মেয়ে, জারা-কে কখনোই জানতে দিইনি।
সে বড় হয়েছে নিজেকে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান মনে করে।
বছরের পর বছর ধরে, সন্তানের শোক আমাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। আমি সবসময় চরম দুশ্চিন্তায় ভুগতাম, নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকতাম, কোনো কিছুতেই মন দিতে পারতাম না। এক পর্যায়ে জারা-র বাবা আর এই মানসিক অশান্তি সহ্য করতে না পেরে আমাকে ডি**ভোর্স দিয়ে চলে যায়।
তাই জীবনটা হয়ে দাঁড়াল শুধু আমার আর জারা-র।
আজ জারা-র স্কুলের প্রথম দিন ছিল। সে বাড়ি ফিরে কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে রেখে বলল:
"আম্মু, কালকে টিফিন ক্যারিয়ারে আরও একটা বাটি বাড়িয়ে দিও তো!"
"কার জন্য রে মা?"
"আমার বোনের জন্য।"
আমি হেসেই উড়িয়ে দিলাম।
ভেতর ভেতর একটা অস্বস্তি নিয়ে।
"স্কুলে তো তোমার কোনো বোন নেই, আম্মু।"
জারা কপাল কুঁচকে তাকাল।
"হ্যাঁ, আছে। সে ক্লাসে আমার পাশেই বসে। তার নাম জেরিন।"
এক মুহূর্তের জন্য আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
আমি তো জারা-কে কখনোই ওই নামের কথা বলিনি!
"সে দেখতে কেমন রে?"
"আমার মতোই, আম্মু। একদম হুবহু আমার মতো। শুধু… আমার ডান গালে যে তিলটা আছে, তার ওটা বাম গালে।"
এরপর সে ব্যাগ থেকে কিছু একটা বের করতে করতে বলল,
"আমি একটা ছবিও তুলেছি!"
সে তার খালার দেওয়া খেলনা ক্যামেরাটা আমার হাতে বাড়িয়ে দিল।
স্কুলের বারান্দার গ্রিলের পাশে দুটো মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
একই রকম গায়ের রঙ, একই উচ্চতা।
একই চোখ।
জারা… আর ঠিক তার অবিকল একটা প্রতিরূপ।
সে রাতে আমি এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারিনি। ফজর নামাজ পড়েই মনটা ছটফট করছিল।
পরের দিন সকালে আমি নিজেই রিকশা নিয়ে তাকে স্কুলে পৌঁছে দিতে গেলাম।
সব মায়েরা তাদের বাচ্চাদের নিয়ে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল, ঠিক তখনই জারা আঙুল উঁচিয়ে দেখাল।
"আম্মু, ওই যে সে!"
আমি গেটের দিকে তাকালাম —
আর বুকের হার্টবিট উঠানামা করতাছে। , আমার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
কিন্তু যে জিনিসটা আমাকে পুরো ভে*ঙে চুরমার করে দিয়েছিল, তা শুধু ওই ছোট্ট মেয়েটি ছিল না।
বরং সেটি ছিল সেই মানুষটি, যে শক্ত করে তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে কোনো অপরিচিত কেউ ছিল না।
সে আমার অত্যন্ত আপন একজন মানুষ।
"তুমি!" আমি ফিসফিস করে উঠলাম। "তোমার কাছ থেকে এই বিশ্বাসঘা*তকতা আমি ম*রলেও কল্পনা করিনি।"
আর ঠিক সেই মুহূর্তে আমার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল, আমি বুঝতে পারলাম—বিগত ছয়টি বছর আমি একটা বিরাট মিথ্যার মায়াজালে বন্দি ছিলাম...
চলবে...
✴️মিথ্যার মায়াজাল
পর্ব ০১
✴️প্লিজ শেয়ার করবেন প্রথম পর্বটি।
কমেন্ট করবেন পরবর্তী পড়তে আগ্রহী কিন?