06/08/2025
ওরা আবার বাঙালি হলো কবে থেকে?
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর কালজয়ী উপন্যাস "শ্রীকান্ত"–এ এক স্থানে স্পষ্টভাবে লিখেছেন:
“খেলা চলতে চলতে হঠাৎ করে মারামারি হলো বাঙালি এবং মুসলমান ছেলেদের মধ্যে।”
শরৎচন্দ্র কি ভাষার অজ্ঞ ছিলেন? তিনি কি জানতেন না যে "মুসলমান" ছেলেরাও বাংলা ভাষায় কথা বলে? নিশ্চয়ই জানতেন। তাহলে তিনি "বাঙালি এবং মুসলমান" বলে আলাদা করে উল্লেখ করলেন কেন?
এর একটাই কারণ—তাঁর যুগের সাহিত্যিক, চিন্তক ও সাধারণ মানুষ স্পষ্টভাবে জানতেন: "বাঙালি" একটি জাতিগত পরিচয়, আর "মুসলমান" একটি ধর্মীয় পরিচয়। এই দুই এক নয়।
যাদের নাম শেখ আব্দুল, মুহম্মদ ফয়েজ, বা জাফর ইকবাল, যাদের সংস্কৃতি, নামকরণ, পোশাক, আচার সব আরব-মধ্যপ্রাচ্য নির্ভর, যাদের উৎসব ঈদ, মহররম, রমজান—তারা কেবল বাংলা ভাষায় কথা বলে বলেই বাঙালি হয়ে যায় না।
আমাদের সংস্কৃতিতে বাঙালি মানে—ভাষা, উৎসব, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, ঐতিহ্য এবং ভূমিপূজিত আত্মপরিচয়—সব মিলিয়ে এক জৈব ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। এই পরিচয় শুধু বাংলা বলা নয়—শারদীয়া, রবীন্দ্র-বঙ্কিম, গঙ্গা-পদ্মা, দুর্গাপূজা, মঙ্গলচণ্ডী, হালখাতা, পয়লা বৈশাখ, পাটশিল্প, ধুতি-পাঞ্জাবি, বরণডালা, হুঁকো, রাধা-কৃষ্ণ, কালু ও গোপাল, মাটির প্রদীপ, বাউল, বৈষ্ণব পদাবলি—এই সবকিছুর সমাহারেই বাঙালি।
শুধু বাংলা ভাষা ব্যবহার করলেই কেউ বাঙালি হয় না। যেমন কেউ ইংরেজি বললেই ব্রিটিশ হয় না।
বাঙালি হওয়ার জন্য দরকার আত্মিক সংযোগ, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, আর আত্মপরিচয়ের প্রতি নিষ্ঠা।
তাদের যদি সত্যিই বাঙালি হিসেবে আত্মপরিচয় থাকত, তাহলে তাদের নাম ‘অরুণ দাস’, ‘সুশীল সেন’ বা ‘শ্যামল মজুমদার’ হতো, 'মোহাম্মদ আকবর' নয়।
শরৎচন্দ্র যেটা বুঝেছিলেন সেই এক সহজ সত্য— বাংলা ভাষাভাষী মানেই বাঙালি নয়। আর মুসলমান মানেই বাঙালি হয় না।
©️সংগৃহীত