27/09/2022
"আড়তে যে সোনালী মুরগীর দাম ৩১০ টাকা কেজি, টাউনহল বা কৃষিমার্কেটে তা ৩০০ টাকা কেজি৷ আমি অনেকদিন এই রহস্য উদঘাটন করতে পারি নি। আড়তের চেয়ে খুচরা বাজারে জিনিসের দাম কম হয় কিভাবে?!? অনেক ঘুরে, অনেক ক্লোজ অবসারভেশনে এর সুলূক সন্ধান পেলাম। এরা আড়ত থেকে ৩১০ টাকায় কেনে ঠিকই কিন্তু ৩০০ টাকায় বেচার জন্য অনেক মেকানিজমের আশ্রয় নেয়। যেমনঃ তারা যে কাটা মেশিনটায় ওজন দেয়, সেটার রিডিং তারা ছাড়া আর কেউ ধরতে পারে না। জবাই দেয়ার পর ড্রামে রাখা মুরগী বদল করে আগে থেকে জবাই করা বা মৃত ছোট মুরগী বদল করে দেয়া হয়, আরও কত কিছু। আমি একদিন এক দাড়িওয়ালা ব্যবসায়ীকে আফসোস করে বললাম, ভাই অন্যরা করছে করুক, আপনিও এই কাজ করছেন। সে লোক বললো, কি করবো ভাই, এইসব না করলে আড়তের চেয়ে কম রেটে কিভাবে দিবো। সবাই করে, এখানে এসব না করে যদি নায্যদামে বেচি, অন্য বিক্রেতারা আমাকে তা করতে দিবে না, গ্রাহকও আসবে না, দাম বেশী বলে।"
বিজনেসের ভাষায় এটাকে বলে, 'রেড ওশান' বা 'রক্তাক্ত লাল সমুদ্র'। সবাই মিলে মারামারি করে দাম কমাতে কমাতে এমন একটা রক্তারক্তি অবস্থা যে, কেনা দামের চেয়ে কম দামে পণ্য বেচতে হচ্ছে। চিন্তা করে দেখুন পুরো ট্রেডটা হারামের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ব্যবসা করে দুটো পয়সা করবে বৈধপথে, তা না করে মিথ্যা বলে দুই নম্বরী করে পণ্য বেচতে হচ্ছে সম্মিলিত এই মারামারির কারণে। অনলাইনে এর কিছু মিল কি পাচ্ছেন। প্রাইসিংটাকে আমরা কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছি?!? ৮০০-৯০০ টাকা ঘি বিক্রি করছে পোলাপাইন কেজি। ৪০০০ টাকা মণের সরিষার তেল বিক্রি করছে ১৫০-২০০ টাকা লিটার। প্রাইসিং যেদিকে যাচ্ছে কিছুদিন পর তো ৫০০ টাকায় বাঘাবাড়ির আঠার ঘি বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকবে না। তাই হবে, হচ্ছে। মধুর ক্ষেত্রে হয়েছে, আমের ক্ষেত্রে হয়েছে, এগুলোতেও হচ্ছে না কে জানে?!?
FMCG মার্কেটের প্রাইসিং নিয়ে আমি বরাবরই ভোকাল। এদেশের FMCG মার্কেটে পণ্যের মূল্য এতো মার্জিনালি সেট করা কেউ স্বাভাবিক পন্থায় ব্যবসা করে সংসার, ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব না। একারণে সম্ভাব্য সকল দুই নম্বরি করা হয়, এবং বছরে একবার দুইবার সিন্ডিকেশন করে দাম বাড়িয়ে সারা বছরের ক্ষতি বা কম লাভ পুষিয়ে নেয়া হয়। আমার এলাকার এক বড় মুদি ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলছিলাম, সে বললো 'ভাই, আমাদের ব্যবসার যেকোন আইটেম আপনাকে বছরে একবার বা দুইবার টাকা এনে দিবেই, সারাবছর ব্যবসা না করলেও লস নাই।'
গরুর মাংস করতে যেয়ে বুঝেছি এখানে কত মেকানিজম। অসুস্থ, মৃতপ্রায় বা মৃত, খামারের বাতিল গরু কেনা, রক্ত প্রবাহিত না করে গলার নলি কেটে গরুকে স্ট্রোক করিয়ে মারা, মাংসে পানি দিয়ে ওজন বাড়ানো, ওয়েট মেশিনে কারসাজি, আরও কত কি?!? একটা দেশি ষাড় গরু গ্রামের হাটেই আস্ত কেনা পড়ে ৭০০/- টাকা কেজি, সেই জিনিস আপনি ঢাকায় বসে মেকানিজম ছাড়া একই দামে কিনে খান কিভাবে।
রেড ওশানে ব্যবসা করতে নামলে সবচেয়ে বিপদে পড়েন যারা সৎভাবে এই মেকানিজমগুলো ছাড়া ব্যবসা করতে চান। অসততার সর্বগ্রাসী স্রোতে এরা বেশিদিন টিকতে পারে না। এরা একদিকে স্বজাতির তোপের মুখে পড়ে, পিকে সিনেমার ভগবানের মূর্তি বিক্রেতার মতো আপনাকে এসে বলবে, 'ধান্দা বন করওয়াগে ক্যায়া', অপরদিকে কাস্টমাররাও আপনাকে বলবে আপনি গলা কাটেন, চড়া মূল্য রাখেন। লেইমম্যান কেউ হলে মানা যেতো, আমাদেরই পরিচিত, সচেতন, স্মার্ট ভাইবেরাদাররা দাম নিয়ে আমাদের খোঁচাতে বিন্দুমাত্র ছাড় দেন না।
রেড ওশানে সবচেয়ে ক্ষতি কার হয় জানেন?!? কাস্টমারের। একদিকে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন অপরদিকে মরা, মৃতপ্রায় রক্ত, পানিমিশ্রিত মুরগী, গরুর মাংস ও দুই নম্বর প্রোডাক্ট খেয়ে স্বাস্থ্যগত ক্ষতির মুখে পড়েন।
মন্দই যখন মেইনস্ট্রিম হয়, তখন ভালোর পথ ছেড়ে পালানো ছাড়া উপায় নেই।
-Sagor Hasnath ভাই