25/09/2025
আমার স্কুলের এক বন্ধু, এখন ফ্লিপকার্ট অ্যামাজনে ডেলিভারি পার্টনার হিসেবে কাজ করে। অনেকদিন পর, আচমকাই দেখা হয়ে গেছে আজ ওর সাথে। সে বলছে, গতকাল থেকে এত কাজের চাপ, হাঁপানোর সময় পাচ্ছে না। শুধু আইফোন ডেলিভারি করে যাচ্ছে। কেউ বেস মডেল কিনছে না। হয় 15 প্রো, 16 প্লাস, 16 প্রো নইলে প্রো ম্যাক্স। এবং ও সবচেয়ে অবাক হয়ে গেছে এটা দেখে, যে সব বাড়িতে ডেলিভারি দিচ্ছে, তার বেশিরভাগই বেশ নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত লাগছে দেখে। টালির চালের বাড়ি, রংচটা পুরোনো একতলা বাড়ি এবং কিছু বস্তিবাড়ি। আমাদের এই লাইনের ধারের বস্তিতেই আজ অবধি ৬ টা মতো ডেলিভারি দিয়েছে।এইসব বাড়িতে পৌঁছলেই বাড়ি থেকে স্কুলে পরা ছেলে মেয়েরা বেরিয়ে আসছে, সঙ্গে তাদের বাবা মা। তাদের পোশাক আসাক এবং বাড়ির অবস্থা দেখে কেউ আন্দাজই করতে পারবে না যে এই বাড়িতে এক লাখ তিরিশ হাজারের ফোন কিনেছে কেউ। সব্বাই আনবক্সিং ভিডিও বানাচ্ছে, তাই দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ডেলিভারি পার্টনারদের। এবং বেশিরভাগ ফোনই emi তে কেনা। বলছে এত ফোন যে ডেলিভার করে কুলোতে পাচ্ছে না, এখন টানা পুজো অবধি শুধু আইফোন ডেলিভারি আছে ওর।
এবার মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে ফাইনান্স কোম্পানিগুলো এই কোনও ডকুমেন্ট ছাড়া স্কুলের ছেলেমেয়েদের ২-৩ বছরের নো কস্ট ইএমআই দিয়ে দিচ্ছে, তারা বসেই আছে কখন এরা একটা ইএমআই মিস করবে তার জন্য। যেই মিস করবে, হুলিয়ে ৩৫-৪০% রেটে পেনাল্টি কাটবে, রিভাইসড রেটে তখন টাকা ভরতে হবে। ১ জন ইএমআই ডিফল্টারের পেনাল্টি দিয়ে ১০ টা নো কষ্টের পয়সা উঠে যাবে।
নিজের ক্রয়ক্ষমতার নাগালের বাইরের একটা জিনিস কিনতে গিয়ে ফাইনান্স কোম্পানির ফাঁসটা গলায় পরে নেওয়া, শুধুমাত্র দেখনদারীর জন্য, একটা এলিট প্রোডাক্ট কিনে জাতে ওঠার চেষ্টা, “আমি একটা আইফোন 16 প্রো এর মালিক” - এরকম ভাবে একটা আইডেন্টিটি তৈরির চেষ্টা, ক্যাপিটালিজমের ম্যানুফ্যাকচার করা শখকে নিজের শখ ভেবে গুলিয়ে ফেলা- এটাই আমাদের ক্রোনি ক্যাপিটাল যুগের মডেল। নোবেলজয়ী ডঃ অভিজিৎ ব্যানার্জীর একটা ইন্টারভিউতে শুনেছিলাম, আমাদের ইকোনমি এমন ভাবেই ডিজাইন করা হয়েছে, যে একটা মানুষ নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত,মধ্যবিত্ত এগুলোর যে ব্যান্ডেই শুরু করুক, যতই পরিশ্রম করুক, আউটলায়ার্স বাদ দিয়ে তারা শেষও করবে যে ব্যান্ডে শুরু করেছিল সেটাতেই। এটাই হচ্ছে সেই ডিজাইন।
এইসব শোনার পর আমার সেই চলো অঞ্জনের সব্যাসাচী চক্রবর্তীর এপিসোডটায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। যিনি বলছেন, “…আমার পাঁচ জনের পরিবার, আমার যদি একটা সাধারণ সুমো গাড়িতে কাজ হয়ে যায় আমি একটা প্যাজেরো কিনতে যাব কেন? এই বেঞ্চমার্কটা আমাকে ঠিক করতে হবে।আমার ভেতর থেকে আসবে এই নিষেধ। এই শিক্ষা আসবে আমার পরিবার থেকে, আমার বাবা মায়ের থেকে, বই থেকে, আমার সেইসব বন্ধুদের থেকে যারা আমার চেয়ে বেশি জ্ঞানী….”।
ইশ এই জীবনবোধটাও যদি স্কুলে পড়ানো হত, সিলেবাস করে, ক্লাস নিয়ে, পরীক্ষা দিয়ে….